পরকীয়ায় নারীর কেন কোন শাস্তি নেই?

পরকীয়ায় নারীর কেন কোন শাস্তি নেই? আইন, ইতিহাস ও নৈতিকতার প্রশ্ন

বাংলাদেশে পরকীয়া নিয়ে সামাজিক আলোচনা নতুন নয়, তবে একটি বিষয় অনেকের কাছে আজও অস্বাভাবিক লাগে—আইনে পুরুষকে শাস্তিযোগ্য ধরা হলেও নারীর বিরুদ্ধে সাধারণত কোনো দণ্ডের বিধান নেই। কেন দুইজন একই কাজে জড়িত হলেও দায় শুধু একজনের ওপর পড়ে? এই বিষয়ের শেকড় খুঁজে পেলে বোঝা যায়—মূল সমস্যাটা বর্তমান নয়, বরং পুরোনো আইন ও চিন্তাধারায়।

🟦 পুরোনো আইন থেকে শুরু: ১৮৬০ সালের বাস্তবতা

বাংলাদেশের ফৌজদারি আইন অনেকাংশেই ব্রিটিশ উপনিবেশিক সময়ের। ১৮৬০ সালের সেই আইনে উল্লেখ ছিল:

কোনো বিবাহিত নারীর সঙ্গে পরকীয়া করলে পুরুষ দোষী,

কিন্তু নারীকে দোষী ধরা হবে না।

তখনকার সমাজে নারীকে স্বাধীন ব্যক্তি হিসেবে দেখা হতো না। তাকে পুরুষের “অধীন” বা “সম্পত্তির অংশ” হিসেবে ভাবা হতো। তাই আইনও নারীকে দায়িত্ববান ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করেনি—বরং “কারো সম্পত্তি” হিসেবে দেখেছে।

সতিদাহ, বাল্যবিবাহ, পিতৃতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ—এসব বাস্তবতা সেই সময়ের আইনেও ঢুকে গিয়েছিল। আজও কিছু দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি পরিবর্তিত হয়নি, কিন্তু সমাজ এগিয়েছে—আইন তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি অনেক জায়গায়।

🟦 সহজ একটি উপমা: ‘চুরি হওয়া ফোন’

ভাবুন আপনার ফোন চুরি হলো।
মামলা করবেন কার বিরুদ্ধে—ফোনের বিরুদ্ধে, নাকি চোরের বিরুদ্ধে?

পুরোনো আইন ঠিক এমনভাবে নারীকে দেখত—তিনি নিজের সিদ্ধান্তের মালিক নন, তাই তাকে “অপরাধী” হিসেবে ধরা হয়নি। ভুলটা করেছে যে পুরুষ, তাকেই দায়ী করা হয়েছে।

কিন্তু বর্তমান সমাজে নারী-পুরুষ উভয়ই স্বাধীন, সচেতন, দায়িত্বশীল ব্যক্তি। তাই সেই পুরোনো আইন ২০২৫ সালে এসে বেমানান মনে হয়।

🟦 বর্তমান বাস্তবতা: বৈষম্যের পুনর্মূল্যায়ন

আজকের সমাজ সমানাধিকার ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার কথা বলে।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে—

যদি পরকীয়া একটি শাস্তিযোগ্য ভুল হয়, তাহলে দায় কি দুইজনেরই হওয়া উচিত নয়?

একজন নারী যেমন নিজের সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম, তেমনি সেই সিদ্ধান্তের ফলাফলের দায়ও তার।
এখানে “নারীকে রক্ষা” করার নামে তাকে দায়মুক্ত করা আসলে সমঅধিকারের ধারণার সঙ্গে যায় না।

🟦 আইন পরিবর্তনের প্রয়োজন কোথায়?

পুরোনো চিন্তাধারার ওপর ভিত্তি করে তৈরি আইন অনেক ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
পরকীয়া নিয়ে যদি সমাজ কোনো অবস্থান নেয়, তাহলে তা হওয়া উচিত লিঙ্গ-নিরপেক্ষ ও ন্যায্য।

এটি শুধু শাস্তির বিষয়ে নয়—এটি দায়িত্ববোধ, স্বাধীনতা এবং সমান অধিকারের প্রশ্ন।

🟦 শাস্তি কি সমাধান?

এখানে একটি বাস্তব প্রশ্ন আছে—
শাস্তি কি পরকীয়া কমায়?

মানব আচরণের ক্ষেত্রে শাস্তি খুব সীমিতভাবে কাজ করে। পরকীয়ার মূল কারণ সাধারণত অনেক গভীরে থাকে:

  • মানসিক দূরত্ব
  • যোগাযোগের ঘাটতি
  • সম্পর্কের অপূর্ণতা
  • ব্যক্তিগত মূল্যবোধ
  • পরিবারিক সংস্কৃতি

তাই শুধুমাত্র আইন পরিবর্তন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না।

🟦 প্রতিরোধের পথ: সম্পর্ক ও নৈতিকতায় কাজ করা

পরকীয়া বন্ধ হয় ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধ থেকে। কিছু কার্যকর দিক:

১. নিজের নৈতিক মানদণ্ড সম্পর্কে স্পষ্ট হওয়া

আপনি কেমন মানুষ হতে চান—এটাই আচরণকে চালিত করে।

২. লয়ালিটি, স্বচ্ছতা ও সততার চর্চা

বিশ্বাস প্রতিটি সম্পর্কের ভিত। বিশ্বাসঘাতকতা সেই ভিত্তিকে ভেঙে দেয়।

৩. সম্পর্ক ভেঙে গেলে লিগ্যাল পথ ব্যবহার করা

অসৎ পথ নয়; বিচ্ছেদ বা আলাদা হওয়ার মতো আইনগত পথ আছে।

৪. পরিবারিক মূল্যবোধের চর্চা

শিশুদের সামনে সম্পর্কের সম্মান ও দায়িত্ববোধ চর্চা সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

🟦 সংক্ষেপে

পরকীয়ায় নারীর শাস্তিহীনতা আসলে ইতিহাস থেকে আসা একটি প্রথাগত ধারণা—যার কোনো ভিত্তি নেই আধুনিক সমাজে।
আজকের দিনে নারী-পুরুষ উভয়েই স্বাধীন, সচেতন এবং সমান দায়িত্ববান।

অতএব, আইনের ন্যায়পরায়ণতা নিশ্চিত করতে হলে—
যে কাজে দুইজন জড়িত, সেই দায়ও দুইজনেরই হওয়া উচিত।

আর ব্যক্তিগত স্তরে প্রকৃত প্রতিরোধ শুরু হয় এখানেই—
আপনি নিজে কতটা সৎ, স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল থাকতে পারছেন।
এটাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় নৈতিক শক্তি।






TherapyRoute Logo