"অভাবঃ অভিশাপ নাকি সৌভাগ্য?" আমাদের জীবনে অভাব কি আসলেই একটি অভিশাপ, নাকি এটি আমাদের জন্য একটি প্রেরণা ও আশীর্বাদ হতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমরা জীবনের বাস্তবতা, প্রতিযোগিতা, প্রিভিলেজ এবং অভাবের মাঝখানে লুকানো সত্যগুলো নিয়ে গভীরভাবে আলোচনা করবো।
জীবনকে অনেক সময় আমরা একটি দৌড় প্রতিযোগিতার মতো দেখি। কিন্তু এই দৌড়ে সবাই একই লাইনে দাঁড়ায় না, সবাই একই দূরত্ব থেকে শুরু করে না। কেউ হয়তো ফিনিশিং লাইনের মাত্র এক কিলোমিটার দূরে, আবার কেউ দশ কিলোমিটার পেছনে। এই অবস্থানগুলোর পার্থক্য আমাদের জীবনের অভাব এবং প্রিভিলেজের পার্থক্যকে বোঝায়।
অনেক সময় আমরা দেখি, যাদের জীবনে কোনো অভাব নেই, তারা যেন জীবনের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতেই চায় না। কারণ তাদের কাছে সবকিছুই আছে, তারা চায় না, তাদের মধ্যে কোনো ক্ষুধা বা প্রেরণা কাজ করে না। অন্যদিকে, যাদের অনেক অভাব, তারা সেই অভাব পূরণের জন্য সারাজীবন লড়াই করে, এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।
আমাদের জীবনে সবাই একই অবস্থান থেকে শুরু করে না। আমি অনেক ক্লায়েন্ট দেখেছি যাদের জীবনে কোনো প্রকৃত লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য নেই, কারণ তাদের জীবনে কোনো অভাব নেই। তারা জীবনকে অনেকটাই স্বস্তির মধ্যে কাটাচ্ছে, কারণ তাদের কাছে প্রয়োজনীয় সবকিছুই আছে।
অন্যদিকে, অনেকেই আছেন যাদের জীবনে অনেক অভাব, যেমন নিজের বাড়ি নেই, গাড়ি নেই, অর্থনৈতিক সমস্যা আছে, পরিবারিক পরিবেশ টক্সিক বা অসুস্থ। এই মানুষগুলো জীবনের প্রতিটি ক্ষণে সেই অভাব পূরণের জন্য সংগ্রাম করে। তাদের মধ্যে একটি ক্ষুধা বা প্রেরণা থাকে যা তাদের এগিয়ে নিয়ে যায়।
এখানেই বোঝা যায় যে প্রিভিলেজ থাকা মানেই সাফল্য নয়, বরং অভাব থাকা অনেক সময় মানুষকে বেশি প্রেরণা দেয়।
আমার অভিজ্ঞতায়, সবচেয়ে সফল মানুষগুলো সাধারণত তাদের জীবনে অনেক বেশি অভাবের সম্মুখীন হয়েছে। তাদের সেই অভাবই তাদের চালিত করেছে, তাদের প্রতিদিন নতুন কিছু শেখার এবং অর্জনের জন্য উদ্দীপ্ত করেছে।
যখন আপনি কিছুই না চান, তখন আপনি উন্নতি বা পরিবর্তনের জন্য মোটেও চেষ্টা করেন না। কারণ আপনার জীবনে সবকিছুই আছে, আপনি আর কিছু চাইছেন না। কিন্তু যখন আপনার জীবনে কিছু অভাব থাকে, যেমন অর্থ, ভালোবাসা বা নিরাপত্তা, তখন সেই অভাব আপনাকে জীবনকে আরও ভালোভাবে গড়ার জন্য প্রেরণা দেয়।
যে মানুষটির জীবনে গাড়ি নেই, সে গাড়ি কেনার স্বপ্ন দেখে। সে টাকা সেভ করে, পরিকল্পনা করে এবং সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য কাজ করে।
যে মানুষটির পরিবারের পরিবেশ টক্সিক, সে ভালোবাসা এবং সাপোর্টের জন্য নতুন পরিবার বা সম্পর্ক তৈরি করতে চায়। সেই অভাব তাকে জীবনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।
আমরা অনেক সময় অন্যের সাথে নিজেদের তুলনা করি। দেখি, সে পারছে আমি পারছি না কেন? কিন্তু বাস্তবে আমরা সবাই একেবারে আলাদা অবস্থানে আছি। আমাদের ব্যাকগ্রাউন্ড, পারিবারিক অবস্থা, অর্থনৈতিক অবস্থা, এবং মানসিক অবস্থা এক নয়।
তাই অন্যের সাথে প্রতিযোগিতা করার বদলে আমাদের উচিত নিজেদের সাথে প্রতিযোগিতা করা। গতকাল আমি কোথায় ছিলাম, আজকে কোথায় আছি, আগামীকাল কোথায় পৌঁছাতে পারি—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করা। নিজের উন্নতির জন্য প্রতিদিন কাজ করা।
অতিরিক্ত প্রিভিলেজ থাকা অনেক সময় আমাদের জন্য একটি কারস হয়ে দাঁড়ায়। কারণ যাদের জীবনে কোনো অভাব নেই, তারা প্রায়ই জীবনে কোনো উদ্দেশ্য খুঁজে পায় না। তাদের কাছে সবকিছুই আছে, তাই তারা নতুন কিছু করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।
অনেকেই তখন সময় কাটানোর জন্য অপ্রয়োজনীয় কাজ যেমন গেম খেলা, ড্রাগস নেওয়া বা অন্য নেগেটিভ অভ্যাসে জড়িয়ে পড়ে। কারণ তাদের জীবনে কোনো ক্ষুধা বা প্রেরণা নেই।
আমাদের জীবনে অভাব কখনোই একটি অভিশাপ নয়, বরং এটি আমাদের জন্য একটি আশীর্বাদ হতে পারে। কারণ অভাবই আমাদেরকে জীবনে এগিয়ে যেতে প্রেরণা দেয়। অভাব আমাদেরকে শেখায় কিভাবে সংগ্রাম করতে হয়, কিভাবে নিজের লক্ষ্যের দিকে ধাবিত হতে হয়।
অন্যদিকে, অতিরিক্ত প্রিভিলেজ আমাদেরকে অলস করে তুলতে পারে এবং জীবনের উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারে। তাই জীবনের প্রতিটি পর্যায়েই আমাদের উচিত নিজের অবস্থান বুঝে নিজেকে প্রেরণা দেওয়া এবং নিজের সেরা সংস্করণ হয়ে উঠার চেষ্টা করা।
"আপনি যে জিনিসটার অভাব বোধ করবেন, আপনি সেই জিনিসটাকে লাইফে গেইন করার চেষ্টা করবেন। যে জিনিসে আপনার কোন অভাব নেই সেই জিনিসটা আপনি আসলে কখনোই চাইবেন না।"
এই হলো জীবনের সত্যি রিয়ালিটি। অভাবকে আমরা যদি সঠিক দৃষ্টিতে দেখতে পারি, তাহলে এটি আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে।
আপনার জীবনের যেখানেই অবস্থান হোক না কেন, নিজের পথ নিজেই তৈরি করুন। নিজের সাথে প্রতিযোগিতা করুন এবং প্রতিদিন একটু একটু করে উন্নতি করুন। কারণ জীবনে আসল প্রতিযোগিতা হচ্ছে আপনার নিজের সাথে।
আশা করি এই চিন্তাগুলো আপনাদের জীবনে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আনবে এবং নিজের জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে পেতে সাহায্য করবে।
যদি এই বিষয় নিয়ে আপনার কোনো প্রশ্ন থাকে, বা আপনার জীবনের সমস্যাগুলো নিয়ে কথা বলতে চান, তাহলে আমার সাথে যোগাযোগ করতে পারেন।